Thursday, September 27, 2018

নবারুণের খেলনানগর : রাষ্ট্রই যখন ঘটায় বিস্ফোরণ আর বানায় খেলার পুতুল


হারবার্ট, যুদ্ধ পরিস্থিতি, বা কাঙাল মালসাটএর মত বেশি পরিচিত উপন্যাসগুলির সূত্রে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বিস্ফোরণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনারত নবারুণ ভট্টাচার্যকেই আমরা বেশি করে চিনেছি, মনে রেখেছি। এই ধারার থেকে একটু ভিন্নধর্মী খেলনানগর নভেলেটটিতে এক অন্য নবারুণকে আমরা দেখি। রাষ্ট্রের দ্বারা শোষিত, নিপীড়িত, জর্জরিতদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ নয়, এখানে রাষ্ট্রকেই ঘাতক বিস্ফোরণকারী হিসেবে দেখিয়ে অসহায় মানুষের ধ্বংসলীলাকে সামনে এনেছেন নবারুণ। দেখিয়েছেন নির্মমতাকে। খেলনানগর উপন্যাসটির হিন্দি অনুবাদ খিলৌনা নগর প্রকাশের সময় মুখবন্ধে তিনি যা লিখেছিলেন তার তর্জমা করলে দাঁড়ায় বিষয়বস্তুকে যদি একটা শব্দে ধরতে চাই, তবে সেটা হল নির্মমতা।... অসউইৎজ-ওসউইচেম এর মৃত্যু শিবির, ট্রেবলিংকা, গুলাগ, ভিয়েৎনাম বা হিরোশিমার নিষ্ঠুরতা। যে ক্রুরতা গত শতাব্দীতে কোটি কোটি মানুষের প্রাণ নিয়েও তৃপ্ত হয় নি। সাম্রাজ্যবাদ আর তারই হাতে তৈরি সন্ত্রাসবাদ, না জানি ভবিষ্যতেও আরও কত কত এরকমই বীভৎসতা আর ত্রাসে ভরা দৃশ্য দেখাবে এখনো এ বিষয়ে আমাদের সঠিক কোনও আন্দাজই নেই। তবে এখনো পর্যন্ত যা ঘটে গেছে আর ভবিষ্যতে তা কতদূর পর্যন্ত ঘটবে, আমরা তার একটা অনুমান অবশ্য করতে পারি, আর তা পারলে শিউরে উঠতে হয়। সর্বগ্রাসী লোভ আর উন্মত্ত মতান্ধতার একদিকে বাণিজ্যিক গোলকায়ন আর অন্যদিকে বাড়তে থাকা নৃশংসতা, সমবেদনাহীনতা, জাতিবিদ্বেষ, জবাবদিহির দায় অস্বীকার করা। এই দুই দানবের নৃশংস তাণ্ডবে শুভবুদ্ধি দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এর পরিণতি কিন্তু এক বিশাল ধ্বংস। ব্ল্যাকহোলের অতল অন্ধকার! চরম নাস্তি! যখন জীবন্ত প্রাণী আর তাদের জীবনই ধ্বংস হয়ে যাবে, তখন কোথায় বসবে বাজার ? কেই বা মুনাফা লুটবে ? ... সবারই ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
১৯৯৮ সালে শারদীয়া পত্রিকার পাতায় প্রথম প্রকাশিত হয় নবারুণের খেলনানগর উপন্যাসটি। কল্পকাহিনীর ছোট্ট এই নগরটি খেলনা বানানোর কারখানাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ১৯৯০ তে আর আখ্যান অনুসারে তা ধ্বংস হয়ে যায় ২০০৪ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর। পত্রিকায় পাতায় উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশের ৬ বছর পরের এই দিনটিতেই গ্রন্থাকারে বেরোয় খেলনানগর। ধ্বংস হবার আগেই অবশ্য প্রায় মৃত, পরিত্যক্ত এক নগরীতে পরিণত হয়েছিল খেলনানগর। আগুন লেগে খেলনা কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাবার পর থেকেই সেখানে কমে আসে প্রাণ চাঞ্চল্য। তারপর এর পশ্চিম প্রান্তে তৈরি করা হয় রাসায়নিক বর্জের আস্তাকুঁড়। বিষে আক্রান্ত হয় খেলনানগর এর জল। নীল হয়ে যেতে থেকে অধিবাসীদের শরীর। ফ্ল্যাশবাকে নগরীর প্রাণচঞ্চল সময়টিকেও আমরা পেয়ে যাই নবাগত আগন্তুক উইনচিটারকে খেলনানগর এর অধিবাসী বামনের দেওয়া কাহিনী সূত্রে।
১৯৯০ সালে একজন ব্যবসায়ী খেলনানগরের পত্তন করে। আগে এখানে কিছুই ছিল না। কয়েকটা টিলা, কাঁটাঝোপ, একটা পরিস্কার জলের ছোট্ট নদী, তার স্বচ্ছ স্রোতের উল্টোদিকে কয়েকটা মাছের এগোবার চেষ্টা এইরকমেরই আরও অনেক জায়গার মতো। তখন এই জায়গাটাকে ঘিরে ছিল বেশ কয়েকটা গ্রাম। সেইরকম একটি গ্রাম থেকেই খেলনা কারখানায় কাজ করতে এসেছিল সাদামুখ চরিত্রটির মতো বেশ কিছু মানুষ। যে ব্যবসায়ী খেলনা কারখানার পত্তন করেন তাদের পারিবারিক ব্যবসা ছিল জাহাজ ভাঙার। ভাইদের সাথে বনিবনা না হওয়ায় তিনি তার অংশ বেচে দিয়ে খেলনা কারখানা গড়ে তোলেন গ্রাম ঘেরা এই শূন্য জনপদটিতে। খেলনা কারখানাটি ছিল দোতলা। দোতলায় ছিল মূল কারখানা, যেখানে তৈরি হত স্টাফড টয়। আর একতলায় ছিল খেলনা বানানোর কাঁচামালের গুদামঘর। সেখানে থরে থরে জমানো থাকত ফাইবার, ফোম রবার ও উলের কাপড়। শুরুর পর থেকেই কারখানার জেল্লা ছিল ভালো। এখানে তৈরি কুকুর, ভালুক, খরগোশ, হাতি, বাঁদর, কুমীর, কচ্ছপ, পেঙ্গুইন ডলফিন, জেব্রা, বেড়াল, তিমিমাছ, বাঘ, ক্যাঙারু ইত্যাদি নানারকম জীবজন্তুর আদলে তৈরি খেলনা দেশ ছাড়িয়ে পাড়ি দিত বিদেশেও। কানাডা আর ইতালিতে খেলনা রপ্তানী হত ভালো পরিমাণে। কারখানা রমরম করে চলত, ছিল শ্রমিক শোষণ আর বিক্ষোভের চেনা ছবি। কারখানা চালু হবার কিছুদিন পরেই কম মজুরী দেওয়ার জন্য শ্রমিকেরা, বিশেষত মেয়েরা ধর্মঘট করে। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর নতুন ম্যানেজার এনে পুনরায় চালু হয় কারখানা।
শ্রমিক আন্দোলনকে দমন করার পদ্ধতি একেবারেই অহিংস ছিল না। বাইরে থেকে ব্যবসায়ী জনা দশেক দক্ষ পুরুষ শ্রমিক আনিয়েছিল। এখানে তাদের নামগত কোনও পরিচয় নেই, রক্তকরবী নাটকের কথা মনে করিয়ে দিয়ে আছে সংখ্যাগত পরিচয়। ধর্মঘটের সময় কারখানার সশস্ত্র গার্ডদের গুলিতে ১ থেকে ৫ মারা যায়। গুণ্ডা এনে শ্রমিকদের দমন করার প্রয়োজন বোধ করে মালিক, নিয়ে আসে হাতকাটা ও তার সঙ্গীদের। পরে রাস্তা অবরোধের আন্দোলনের সময় ৬ ও ৭ কে খুন করে তারা।
খেলনানগরের সূত্রে পুঁজিবাদী শোষণ তথা উৎপাদন পদ্ধতির দমনমূলক দিকগুলিকে প্রায় ছোটদের রূপকথার গল্পের সরল অনাড়ম্বর কায়দায় সরাসরি এখানে হাজির করা হয়েছে। যদিও কারখানা স্তরে এই শোষণ-দমন সামগ্রিক ও চরম নির্মমতা ও নিষ্ঠুরতার ভূমিকামাত্র। পরে নবারুণ আমাদের সামগ্রিক ধ্বংসের বিতত বিতংসটির মুখোমুখি করবেন। তার আগে আমরা দুর্ঘটনার আড়ালে আসলে এক গণহত্যাকেই সংগঠিত হতে দেখি কারখানার মধ্যে। কারখানায় আগুন নেভানোর ব্যবস্থা ছিল না। আগুন লাগতে পারে কিনা দেখার জন্য যে ইনস্পেক্টর এসেছিল তাকে প্রাণের ভয় দেখিয়ে ও ঘুষ দিয়ে সার্টিফিকেট আদায় করে নেওয়া হয়। দোতলায় শ্রমিকেরা ঢুকে যাবার পরে গ্রিলের দরজা তালা দিয়ে দেওয়া হত। কেউ যাতে মাল চুরি করতে না পারে সেইজন্য প্রত্যেকটা জানলায় শিক তো ছিলই, বাইরে থেকে জালও লাগানো হয়েছিল।
বিশ্বায়নের রমরমা বাজারে ৯৮ এর ফুটবল বিশ্বকাপের আগে ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক টয় ফুটবলের অর্ডার এসেছিল। সে জন্য আরো বেশি শ্রমিক, বিশেষত সেলাই জানা মেয়েদের দরকার হয়ে পড়েছিল। পুরোদমে যখন কাজ চলছে তখনই আগুনটা লাগে। দুর্ঘটনার তারিখটিকে ১লা মে হিসেবে চিহ্নিত করে নবারুণ শ্রমিক অধিকার সংক্রান্ত নিষ্ঠুর আয়রনিটা স্পষ্ট করেছেন।
দিনটা ছিল মে দিবস ১ মে। মুহূর্তের মধ্যে লেলিহান আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। দোতলায় ওঠার যে একটাই সিঁড়ি সেটা ছিল কাঠের। ওপরে, হিসাবমতো বলা হয়েছে ৮১ জন পুড়ে মারা যায়। ৬ ঘন্টা ধরে আগুন জ্বলেছিল। যারা মারা যায় তাদের মধ্যে বেশিরভাগই মেয়ে। এরা আশেপাশের গ্রাম থেকে আসত বা বাইরে থেকে এসে খেলনানগরে থাকত। মৃতের সংখ্যা অবশ্য কখনওই ঠিক করে জানা যাবে না। কারণ অনেককে আলাদা করে চেনাই যায় নি। ... ক্ষতিপূরণ? যারা আহত হয়েছিল তাদের হদিশই পাওয়া যায় নি। যদিও বলা হয়েছিল যে চিকিৎসার জন্য তাদের বাইরে পাঠানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে একমাত্র সাদামুখ লুকিয়ে সেরে ওঠে। ৮, ৯ আর বুড়ো দরজি বেঁচে যায়। কিন্তু দুর্ঘটনার পর ওদের তিনমাস আটকে রাখা হয়েছিল যাতে খবর না পাচার হয়।
নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতাকে দুটো স্তরে বিন্যস্ত করে খেলনানগর উপন্যাসে নিয়ে আসেন নবারুণ। প্রথমটা আমাদের রোজকার অভিজ্ঞতায় খানিক চেনা শ্রমিক শোষণ আর দমনের স্তর। কিন্তু দ্বিতীয় স্তরটা আমাদের সাধারণ চোখের বাইরে থাকা রাষ্ট্রের বৃহত্তর নির্মমতা আর নিষ্ঠুরতা। অগ্নিকাণ্ডের পর খেলনানগর প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে গেছে ধরে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদের কাছে, কর্পোরেট ক্যাপিটালের কাছে নতজানু রাষ্ট্র যে নিষ্ঠুরতার খেলায় নামে।
দেশজুড়ে যখন গৃহযুদ্ধ চলছে তখন রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় অস্ত্রের ব্যবহার ও তার আবর্জনা বেড়ে চলবে এটাই স্বাভাবিক। আবার পশ্চিমা বিশ্বের দামি জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেখানাকার রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় পদার্থেরও ডাম্পিং গ্রাউন্ড চাই। কিছু ডলারের বিনিময়ে তৃতীয় বিশ্বের সার্বভৌম দেশের যো হুকুম রাষ্ট্রনেতারা সর্বদাই প্রস্তুত নিজেদের জমিকে এ কাজে ব্যবহার করতে। ফলে খেলনানগরের মানুষ অবাক হয়ে দেখতে থাকল তাজ্জব এক কাণ্ডকারখানা। পরের পর ট্রাক আসছে, পোড়াপাথর বা রবারের দলার মতো দেখতে জিনিস ফেলছে, তারপর ফের ওই আবর্জনা আনার জন্য ফাঁকা ফিরে যাচ্ছে। নিয়ম মেনে যেমন পিঁপড়েরা সার দিয়ে কাজ করে সেরকম।
এর ফল দাঁড়াল খেলনানগরের পশ্চিমদিকে তৈরি হল কৃত্রিম এক পাহাড়, রাসায়নিক ও তেজস্ক্রিয় আবর্জনার পাহাড়। পাহাড় তৈরির পর প্রথম বর্ষা যখন এলো তখনই খেলনা নগরের মানুষ প্রথম ভালোভাবে বুঝলো এই পাহাড় আসলে বিষের পাহাড়।
নদীর জলের রঙ পালটে গেল। মাছ মরে গেল। গাছপালা এদিকে এমনিতেই কম কিন্তু নদীর পাড় দিয়ে একজাতের কাঁটা ঝোপ হত। ওতে হলুদ ফুল হত। সেই ঝোপগুলো মরে গেল।
নদীর বিষাক্ত জলই খেতে হত। ফলে সকলের হাতে পায়ে নীল নীল দাগ হয়ে গেল। এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছিল খেলনানগর। আর তাই বিনা দ্বিধায় একে মৃত্যুর ল্যাবরেটরি বানিয়ে ফেলল রাষ্ট্র। উইনচিটারের মত রাষ্ট্রের গুপ্তচররা অপারেশনের আগে এসে শেষবারের মত জরুরী পর্যবেক্ষণগুলি করে গেল। তারপর আকাশ থেকে নেমে এল নিরীক্ষার মারণবোমা। উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদে উইনচিটারের জবানীতেই এসেছে রাষ্ট্রীয় নির্মমতার কাহিনী।
খেলনানগরে আমাদের ছিল একটা টপ সিক্রেট সামরিক তৎপরতা যার নাম অপারেশন ভালচার। রিমোট সেন্সিং এর যন্ত্র বসানো শকুন তখন অনেক ওরকম বিচ্ছিন্ন ও বিপন্ন হ্যামলেটে পাঠানো হয়। দেখা হয় সেখানকার মানুষ কী মানুষ রয়েছে, না অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে যাদের খরচ করে ফেলা যায়? ... এর আগে ফিশন ও ফিউশন অস্ত্র আমরা তৈরি করেছি, এর আঘাত যেমন খেয়েছি, তেমন এর আঘাতও হেনেছি। খেলনানগরে আমরা পরীক্ষা করেছি নিউট্রন বোমা যার বিশেষ পারদর্শিতার জন্য কেউ কেউ একে ক্যাপিটালিস্ট বোম্বও বলে থাকে। খেলনানগরের ওপরেই আমাদের নিউট্রন বোমার প্রথম পরীক্ষা হয় ও সেই পরীক্ষা সম্পূর্ণ সফল। এনহানসড রেডিয়েশন ওভারহেড বলে অভিহিত এই অস্ত্র নিউট্রন ফিশনের ওপর নির্ভরশীল। এর বিস্ফোরণের ফলে যে তাপ ও ঝটিকাঘাতের সৃষ্টি হয় তা তুলনামূলকভাবে ছোট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু ওই জায়গাটুকুর মধ্যে নিউট্রন ও গামা তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপক তরঙ্গ ওঠে যা বর্ম ও পুরু আস্তরণ অক্লেশে ভেদ করে ও যে কোন জীবন্ত কোষকে নিমেষে ধ্বংস করে। সম্পদ বা অন্য কিছু এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয় না। স্বল্প পরিসরের মধ্যে এর ধ্বংসক্ষমতা পর্যাপ্ত এবং এর রেশ দীর্ঘমেয়াদী নয়। তাই ট্যাঙ্ক বাহিনীর বিরুদ্ধে রণকৌশলগত অস্ত্র হিসেবে এর ব্যবহার খুবই কার্যকর হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এবং এই অস্ত্র যেখানে ব্যবহৃত হবে তার কয়েক মাইল দূরে যদি জনবসতি থাকে তার কোনও ক্ষতি হবে না। আমরা খেলনানগরের ওপর বিমান থেকে নিউট্রন বোমা ফেলেছি। কিন্তু ল্যান্স ক্ষেপণাস্ত্র বা ৮ ইঞ্চি অর্থাৎ ২০ সেন্টিমিটার হাউটজার কামানের সাহায্যেও নিউওট্রন বোমা ছোঁড়া যায়।
উইনচিটার চরিত্রটিকে আমরা দ্য নিউক্লিয়ার উইনটার বইটা পড়তে দেখি। নিউক্লিয় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে গণহত্যা চালানোর সঙ্গে যুক্ত লোকটির ঠান্ডা শীতল ভাবনায় মারণ পরিকল্পনা চালানোর গোটা বয়ানটিকে নবারুণ তুলে আনেন ঠাণ্ডা নির্লিপ্তিতে। আখ্যানে জড়িয়ে দেন এক হিমশীতল ভয়ের চাদর। এই ব্যাপক ষড়যন্ত্র, এই বিতত বিতংসের হাত থেকে উদ্ধার পাওয়ার ক্ষেত্রে বা তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের দৈন্যন্দিন চেনা ছকগুলিও একেবারেই অকার্যকরী। নবারুণ উপন্যাসে গুরূত্বের সঙ্গেই পুনরাবৃত্তভাবে হাজির করেন মার্কস লেনিন অনুগামী দুই নীতিনিষ্ঠ ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ৮ ও ৯ এর নিরলস সংগ্রামকে। কিন্তু নয়া এই বিপদের মাত্রাকে অনুধাবন করতেই তাদের প্রচলিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সক্ষম নয়, প্রতিরোধ তো দূরের কথা। রাষ্ট্রের সন্ত্রাস ও নির্মমতার হিমশীতল পরিকল্পনার সামনে অসহায় আত্মসমপর্ণের বিধিলিপি সত্যই নবারুণের সাহিত্যে এক ব্যতিক্রমী দিক। নবারুণ যেন বলেন আমরা সবাই এখন পরিণত হয়েছি এক খেলনা নগরের বাসিন্দাতে। আর নয়া জমানার এই পুতুলনাচের ইতিকথাতে নির্মম আর নিষ্ঠুর এক ব্যবস্থায় আমাদের খেলার পুতুল বানিয়ে ক্রমাগত অদৃশ্য সুতোর টানে নাচানো হচ্ছে। পরিত্রাণ কোথায় ?

শতাব্দীর সন্ধিলগ্নে রাষ্ট্রবিপ্লবের মহড়া অথবা কাঙালদের মালসাট বা আস্ফালন বৃত্তান্ত


  ঘাটের দু ধারে বসার রোয়াক। বাঁ দিকটাতে তিনজন বসেছিল। একজন ঢ্যাঙা, একজন বেঁটে মোটা আর তিননম্বরকে দেখলেই বোঝা যায় পাগলাখ্যাঁচা। ... এই ফাঁকে বলে নেওয়া যাক যে, বাঁ দিকের তিনজন হল ফ্যাতাড়ু যারা গোপন একটি মন্ত্রের বলে উড়তে পারে এবং নানা ধরণের অনুষ্ঠান বা সুখের সংসারে ব্যাগড়া দিয়ে থাকে। ফ্যাতাড়ু আরও অনেক আছে। কিন্তু আপাতত এই তিনজনকে চিনলেই কাফি। ঢ্যাঙা মালটা হল মদন। ওর ফলস দাঁত পকেটে থাকে। বেঁটে কালো মোতাটা হল ডি এস। ওই নামে একটি হুইস্কি আছে ডিরেক্টরস স্পেশাল। ওর তোবড়ানো মচকানো ব্রিফকেসের দু পাশে নাম ও পদবির আদ্যক্ষর সাঁটা আছে যদিও পড়া কঠিন। তিন নম্বর স্যাম্পেলটা হল কবি পুরন্দর ভাট।
পাঠকের সাথে ফ্যাতাড়ুদের নবারুণ প্রথম পরিচয় করালেন খানিকটা অনাড়ম্বর ভাবেই। কিন্তু ফ্যাতাড়ুরা ও তাদের চমকপ্রদ কার্যকলাপ (মালসাট কথাটির অর্থ মল্ল আস্ফোট বা বানরদের হাতের আস্ফালন। দ্রষ্টব্য বাঙ্গালা ভাষার অভিধান জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস দ্বিতীয় খন্ড পৃ ১৭৬২, সাহিত্য সংসদ প্রকাশনা)  সমকালীন বাংলা আখ্যান সাহিত্য ও সেই পরিধি পেরিয়ে সার্বিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল এমনকী সমাজতত্ত্ব রাজনীতি জগতেও সাড়ম্বর চর্চার বিষয় হয়ে উঠল অনতি বিলম্বেই। ১৯৯৯ এর শেষ মাসটিতে প্রমা পত্রিকায় প্রথমবারের জন্য ধারাবাহিক উপন্যাস লিখতে শুরু করেন নবারুণ, ‘’কাঙাল মালসাট এর দ্বিতীয় কিস্তি নতুন শতাব্দীর প্রথম মাসে ফ্যাতারুদের পরিচয় নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। কাঙাল মালসাট ছাড়াও বিভিন্ন ছোটগল্প সংকলনে ফ্যাতাড়ুরা এসেছে, যেমন ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক এ বা ফ্যাতাড়ুর কুম্ভীপাক এ। ফ্যাতাড়ুদের বিচিত্র কার্যকলাপ এর এপিসোডিক বিবরণ সেখানে পাওয়া যাবে। আপাতত আমাদের আলোচনা কাঙাল মালসাট কে নিয়েই।
কাঙাল মালসাটে ফ্যাতাড়ুদের প্রথম উন্মোচন, যেখানে ফ্যাতাড়ু আর চাকতিদের যৌথ ফ্রন্ট ওয়ার ঘোষণা করে লালবাজার তথা রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে। এর আগে নকশালবাড়ি ও সেইসূত্রে রাষ্ট্র ও বিপ্লব এর ধারণাকে নবারুণ নানাভাবে নিয়ে এসেছেন হারবার্টযুদ্ধ পরিস্থিতিতে। নকশালবাড়ির কিছু উল্লেখ কাঙাল মালসাট এও আছে, কিন্তু তার খানিক অপরিকল্পিত প্রস্তুতির কথাই এখানে ইঙ্গিৎ করেন নবারুণ। তবে নয়া রাষ্ট্রবিপ্লবে সেখান থেকে প্রেরণা নেওয়ার ব্যাপারটা অবশ্যই আছে। নকশালদের কোনও পরিকল্পনা ছিল কি? থাকলেও আগেভাবেই তো তারা মরে গেলো। অথবা প্রথমে আর সি পি আই, পরে নকশাল সবই আনপ্রিপেয়ার্ড স্ট্রাগল। অথচ স্বপ্ন দেখা তো থামেনি। সেই বন্দুক আজ আমরা হাতে হাতে, ঘরে ঘরে ...
 রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় পুরদস্তুর এক মিলিটারি স্ট্রাটেজির কথা ভাবে ফ্যাতাড়ু-চাকতি যৌথ ফ্রন্টের কমাণ্ডার মার্শাল ভদি এবং  উপন্যাসের অগ্রসরণের সঙ্গে সঙ্গে আমরা ক্রমশ সেই পরিকল্পনার সাথে পরিচিত হই। অবশ্যই কাঙাল মালসাট একটি বিশিষ্ট রাজনৈতিক উপন্যাস কিন্তু ফ্যাতাড়ু-চাকতিদের রাজনীতিটা টানা কোনও ন্যারেটিভ বা বর্ণনার মধ্য দিয়ে এখানে আভাসিত নয়। বরং চলতি রাষ্ট্র ও রাজনীতি কাঠামোর একটি পুরোদস্তুর ক্রিটিক হিসেবেই তাদের যাবতীয় কার্যকলাপ। সেই রাষ্ট্র ও রাজনীতি কাঠামোর বিভিন্ন দিকগুলিকে নবারুণ উপন্যাসের বিভিন্ন পরিসরে ছড়িয়ে রাখেন। ফ্যাতাড়ুদের ডিসরাপশান অভিমুখী কার্যকলাপ এর সঙ্গে আখ্যানের এই প্যাটার্নটা বিশেষ সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই উপন্যাস যখন লিখছেন নবারুণ তখন ভারতে নব্য উদার অর্থনীতির জমানা এক দশকের বেশি সময় অতিক্রম করে ফেলেছে। সমস্ত কিছু সহ ছোটদের খেলাধূলাকেও পণ্য বানাবার কারবার সাফল্য পেয়েছে, পাড়ায় পাড়ায় রমরমিয়ে চলছে ক্রিকেট কোচিং ক্যাম্প। আজ বাঙালি অন্য নানা খেলার মতো ফুটবলেও কেলিয়ে পরেছে এবং ক্রিকেট বা টেনিসে গুচ্ছের টাকা বলে বাঙালি বাপ মায়েরা বাচ্চাগুলোকে হ্যাঁচকা টানে ঘুম থেকে তুলে মাঠে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে নাকি হুদো হুদো কোচ, যারা বরং কোচোয়ান হলে আরও ভালো হত।
ফ্রেডরিক জেমসন যাকে কালচারাল লজিক অব লেট ক্যাপিটালিজম বলেছিলেন পোস্টমর্ডানিজম নামাঙ্কিত তাঁর বিখ্যাত বইতে, তা তখন ভালোরকম ফ্যাশানেবল। দেরিদা ফুকো লাঁকা বাখতিন আদি ব্যক্তিবর্গ উচ্চারিত হন কিন্তু তাদের চিন্তার ছকভাঙা প্যাটার্ন এর বাইরে থাকতেই পছন্দ করে এসব আউড়ানো বুদ্ধিজীবী আজ্ঞাবহ দাসকুল। বস্তুতপক্ষে কাক কাকের মাংস খায় না এই প্রবাদকে এড়িয়ে গিয়েই সমকালীন বুদ্ধিজীবী মহল/লেখক সমাজকে নিয়ে নবারুণ ভালোরকম তামাসা করেছেন এখানে। আজ বাঙালি কথায় কথায় সেমিনারে বাখতিন ফুকো ঝাড়ে, ভবানীপুর এলাকায় পাঞ্জাবি ও গুজরাটিদের দাপট ও রোয়াব সম্বন্ধে গ্রামসির হেজিমনি তত্ত্ব আওড়ায়, বিগ ব্যাং হইতে স্মল ব্যাঙাচি সকলই তার নখের ডগায় ডগোমগো হইয়া রহিয়াছে... কিন্তু আসলে বুলি সর্বস্ব এরা আজ্ঞাবহ দাস বৈ অন্য কিছু নয়। পুরন্দর ভাটের কয়েকটি অমোঘ লাইন এর মধ্য দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের প্রতি ক্রিটিকটাকে স্যাটায়ারের বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গেছেন নবারুণ
আজ্ঞাবহ দাস, ওরে আজ্ঞাবহ দাস
সারা জীবন বাঁধলি আঁটি,
ছিঁড়লি বালের ঘাস,
আজ্ঞাবহ দাসমহাশয়, আজ্ঞাবহ দাস!
যতই তাকাস আড়ে আড়ে,
হঠাৎ এসে ঢুকবে গাঁড়ে,
বাম্বু ভিলার রেকটো কিলার,
গাঁট পাকানো বাঁশ,
আজ্ঞাবহ দাস রে আমার, আজ্ঞাবহ দাস।
বুদ্ধিজীবীদের ক্ষমতাধরের সঙ্গে হাঁটার স্পৃহা ও সময় বিশেষে নিরপেক্ষ থাকার আড়ালে গা বাঁচানো মনোভাবটি নবারুণ আবার ফিরিয়ে আনেন স্বাক্ষরিত নির্বিষ সব বয়ান প্রকাশনার মধ্যে দিয়ে দায় সারার মানসিকতার সূত্রে।
এ কথা কে না জানে কোথাও কোনো গুরূত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটলে বাংলার বুদ্ধিজীবীরা কালবিলম্ব না করেই সদলবলে একটি ঘোষনাপত্র বা আবেদন বা একটি ফাঁকা থ্রেট প্রকাশ করে থাকেন যাতে বড় থেকে ছোট, শুডঢা থেকে কেঁচকি, লেখক শিল্পী, গায়ক, নৃত্যশিল্পী, নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্র শিল্পী থেকে শুরু করে সকলেই সই দিয়ে নিজেরাও বাঁচেন অন্যদের বারটা বাজাবার রসদ যোগান। শুধু এই ধরনের আবেদনে বা প্রতিবাদপত্রে সই করেই অনেকে লেখক বলে নিজেদের পরিচিত করতে পেরেছেন। কেউই এই ধরণের ব্যাপারে সই দেওয়া থেকে বাদ পড়তে চান না। বাদ পরে গেলে খচে লাল হয়ে যান।
ফ্যাতাড়ু ও রাষ্ট্রশক্তির যুদ্ধের সময়ে তারা নাকি লিখেছিল সংগ্রাম যেমন দরকার তেমন বিশ্রামেরও দরকার। শেষোক্ত প্রয়োজনটি আমাদের খুবই বেশি।
উপন্যাস রচনার সমকালে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার শিল্পায়ন উন্নয়নের নতুন মডেল এর কথা সোচ্চারে সামনে আনছিল। নবারুণ কিন্তু ক্লাস লাইন থেকে সরেন নি একটুকুও। শিল্পায়নের ঢক্কানিনাদ এর তলায় আসলে বহমান বি শিল্পায়নের বাস্তব ছবিটা তুলে আনেন তিনি। উপন্যাসের সপ্তম পর্বে ওয়েস্ট বেঙ্গল ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন এর সম্মেলন ও সেই সূত্রে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পে নতুন জোয়ার আসছে এই সরকারী প্রচারকে নিয়ে রঙ্গতামাসা রয়েছে, রয়েছে উন্নয়নের সামগ্রিক মডেলটিকে নিয়েই তীব্র খেউড়। বস্তুতপক্ষে চাকতি ও ফ্যাতাড়ুদের দ্বারা সাবঅল্টার্ন সাবভার্সান এর ব্যাকড্রপ হিসেবে এই পলিটিকাল ক্রিটিকটাকেই ক্রমশ সামনে আনতে থাকেন নবারুণ।
আজ চেয়ারম্যান (উক্ত ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের) শালা নার্সিংহোমে গেছে, এর পরে দেখবি কি হয়। কোনো ঢপবাজকে আমরা রেয়াত করব না। কম করে ৫০ হাজার ছোট বড় কারখানা হয় বন্ধ নয় হাঁপের টানে ধুঁকছে। সেদিকে কারো খেয়াল নেই, বাড়া ডাউনস্ট্রিম মারাচ্ছে। ফরমুলা ওয়ান রেসিং! হোটেল! কার পার্কিং প্লাজা! সামলাও এবার চাকতি।
বন্ধ কলকারখানার প্রসঙ্গ যেমন এখানে আসে, তেমনি আসে হকার উচ্ছেদ অভিযানের কথাও। আমাদের ভুলে যাবার নয় উপন্যাস রচনার কাছাকাছি সময়ে হকার উচ্ছেদ তথা অপারেশন সানসাইন নিয়ে বিপুল আলোড়ন এর কথা।
অভিমুখ বদলের পেছনের কারণকে সামনে আনেন নবারুণ। স্পষ্টভাবেই। লেফট ফ্রন্ট সরকার নিও লিবারাল অর্থনৈতিক নীতিমালার সঙ্গে কীভাবে আস্তে আস্তে সমীকৃত হয়ে যাচ্ছে সেটা দেখান তিনি। ধরে দেন বদলে যাওয়া নেতৃত্বের চেহারাটিও। সি এম এর মধ্যে যদি জ্যোতি বসুর ছায়া দেখি আমরা, তবে কমরেড আচার্য নিশ্চিতভাবেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর আদলটিকে মনে করিয়ে দেয়। সমকালীন সি পি এম এ দু লাইন এর দ্বন্দ্বও এখানে এসেছে, এসেছে তার মধ্যে কমরেড আচার্যর দোদুল্যমান অবস্থানের কথা।
উপন্যাস রচনার সেই সময়টিতে সি পি এমের মধ্যে সমীর পুততুণ্ড, সৈফুদ্দিন চৌধুরীরা তখন প্রকাশ্যেই বাধাহীন উন্নয়ন এর পক্ষে সওয়াল করছেন, কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলছেন। সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক লাইন গ্রহণের প্রশ্নে কমরেড আচার্যর মত অনেকেই তখন দোদুল্যমান। আসলে দক্ষিণমুখী অভিযাত্রার প্রবক্তাদের নিয়ে সাংগঠনিকভাবে কি করা হবে দ্বন্দ্ব এখানেই তো সীমিত ছিল না, পুঁজিবাদী উন্নয়নকে ব্যবহার করে নেওয়া যায় কিনা সেই ভাবনায় কমরেড আচার্যরাও বেশ দ্বিধাগ্রস্থ তখন। পরবর্তী এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে সে যাত্রায় দক্ষিণপন্থী অভিযাত্রীরা পার্টির বাইরে চলে গেলেও ক্রমশ উন্নততর বামফ্রন্টের নামে গোটা সরকার ও তার প্রধান নায়কেরা নিজেরাই সরবে দক্ষিণমুখী অভিযাত্রায় সামিল হয়েছেন। সে পর্ব অবশ্য উপন্যাসের আলোচ্য সীমা চোহদ্দির বাইরে। এখানে কমরেড স্ট্যালিনের সঙ্গে আধা তন্দ্রার ঘোরে থাকা কমরেড আচার্যর যে কল্প সংলাপ শুনিয়েছেন নবারুণ, তা আসলে বিপ্লবী বামপন্থা ও সংশোধনবাদী প্রবণতার মধ্যে চলমান দ্বিরালাপই।
বিপ্লব করেছিস? কাকে বলে জানিস ? ...করিস ত শালা ভোট। আর কিছু করতে পারবি বলেও ত শালা মনে হয় না। যেগুলো আলটু ফালটু গাঁইগুঁই করছে সেগুলোকে এত তোয়াজ করছিস কেন ? ...
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমরা ওদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যেখানে দু মাস বরাদ্দ সেখানে তিন মাস ...
ওদের কথা বাদ দে। তর মনটা কোন দিকে? সেটা কি ঠিক করেছিস ? ...
কিছু তো ভেবে উঠতে পারছি না
কুকুর যেভাবে বমির কাছে ফিরে যায় সেভাবেই ওরা বুর্জোয়া গলতায় গিয়ে ঢুকবে...
কমরেড আচার্য তার দোদুল্যমানতা নিয়েও শেষমেষ সি এম এর নির্দেশে প্রধান শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠকে হাজির থাকেন। ফ্যাতাড়ু চোক্তাররা তাদের কার্যকলাপ শুরু করতেই পুলিশ কমিশনারকে  রাষ্ট্রযন্ত্রের যা করার তা করতে নির্দেশ দেন, কেবল মানবাধিকার কমিশনের সম্ভাব্য ফ্যাকড়াগুলি মাথায় রেখে।
নবারুণ আমাদের চেনা কথাটাই আর একবার মনে করিয়ে দেন - এই গোটা পরগাছা শ্রমজীবী ঠকানো য়ার্থিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখা হয় রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার প্রধান সশস্ত্র অঙ্গ পুলিশ/মিলিটারি দিয়ে। ফ্যাতাড়ু/চাকতিরা তাই রাষ্ট্রযন্ত্রের কোলকাতার হেডকোয়ার্টার লালবাজার ও অন্যান্য থানাগুলির ওপর এবং তার কর্তাব্যক্তিদের ওপর ওয়ার ডিক্লেয়ার করে। এই যুদ্ধের দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্বের বর্ণনা নবারুণ বিভিন্ন পর্বে দিয়েছেন। বোমার বারুদের মশলার ভাগ থেকে ছোট পর্তুগীজ কামানের ব্যবহার, চাকতি ও ফ্যাতাড়ুদের ওড়ার ক্ষমতাকে বোমারু বিমানবাহিনী হিসেবে কাজে লাগানোর নিপুণ পরিকল্পনা, ম্যানহোলের ভেতর থেকে আচমকা বেরিয়ে এসে শত্রুপক্ষকে চমকিত ও ঘায়েল করার কৌশলগুলি প্রায় গেরিলা ওয়ারফেয়ার ম্যানুয়াল থেকেই যেন নিয়ে এসে তাকে ফ্যান্টাসাইজ করেন নবারুণ।
নিশ্চিতভাবে রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের কথা এখানে আছে তার ফ্যান্টাসি ধর্মীতা আমাদের চোখ এড়ায় না। কিন্তু ফ্যান্টাসি নির্মাণের মধ্যেও নবারুণ তার ক্লাস লাইনকে ধরে রাখেন। একদিকে সরকার পক্ষ থেকে যখন উন্নয়ন শিল্পায়ন এর ফ্যান্টাসি রচনা করে মুক্ত পুঁজির লুঠেরা চরিত্রকে অবাধ বিচরণের জায়গা দেওয়া হয়, তখন তার বিপ্রতীপে নবারুণ রাষ্ট্রবিপ্লবের ফ্যান্টাসি নির্মাণ করেন নিম্নবর্গের মানুষগুলিকে তার সেনাবাহিনীর পুরোভাগে রেখে। দেখান তাদের আগ্রাসনের সামনে শেষপর্যন্ত রাষ্ট্র পিছু হটে এবং বিপ্লবীদের সঙ্গে শেষমেষ আপোষরফায় বাধ্য হয়। ঘরে বাইরে পিছু হঠার বাস্তবিক সময়ে ফ্যান্টাসির জগতে হলেও রাষ্ট্রবিপ্লব পরিকল্পনার দুরন্ত বৈপ্লবিক স্পর্ধাই কাঙাল মালসাটকে বিশিষ্ট করে তোলে।

Tuesday, April 25, 2017

যুদ্ধ পরিস্থিতি : রাষ্ট্র ও বিপ্লব এবং নবারুণ



যুদ্ধ পরিস্থিতি : রাষ্ট্র ও বিপ্লব এবং নবারুণ

হারবার্ট এর পর নকশালবাড়ির বিপ্লবী রাজনীতি, রাষ্ট্র ও বিপ্লবের আঙ্গিনায় নবারুণ আবার ফিরলেন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে। মাঝে লিখেছেন ভোগী। হারবার্ট এ নকশালবাড়ির যোদ্ধা বিনু ছিল এক পার্শ্ব চরিত্র আর নায়ক হারবার্ট তাতে নেহাতই ক্ষীণভাবে ক্ষণিক সময়ের জন্য যুক্ত। যুদ্ধ পরিস্থিতির নায়ক রণজয় কিন্তু সরাসরি নকশালবাড়ি রাজনীতির মানুষ, তার স্মৃতি আর সত্তা বিপ্লবী ভাবনায় জারিত। একদা গেরিলা যোদ্ধা ও বর্তমানে মানসিক ভারসাম্য হারানো প্রৌঢ় যে রণজয়কে আমরা এই আখ্যানে দেখি সে সত্তরের আগুনঝরা সময়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে রণে নেমেছিল এবং ধাক্কার মুখে পড়েছিল। রণজয় ও তার বিপ্লব প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের তীব্র দমননীতি এবং আরো কিছু কারণে আপাত পরাজিত কিন্তু লড়াইয়ের অঙ্গীকারে তারপরেও আত্মজাগ্রত। সময়টা সত্তরের পর কেটে গেছে আরো পঁচিশ বছর। কিন্তু ১৯৯৪ তে, যে বছর সি পি আই (এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারও আপোষ করে নিল কেন্দ্রের নয়া উদারনীতির সঙ্গে, যখন রাষ্ট্রের সঙ্গে মোকাবিলার জন্য লুকিয়ে রাখা রাইফেলের স্তুপের ওপর উঠে গেল ফ্ল্যাটবাড়ি, সে বছরও রণজয় গেরিলা যুদ্ধ আর বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাতেই নিবিষ্ট। বাস্তবতা মেনেই সমাজ সংসার আর পারিবারিক শুভ্যানুধায়ীদের তৎপরতায় তার স্থান হয় মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। কিন্তু সেখানে থাকলেও বিপ্লবের নির্মম শত্রু, রাষ্ট্রের সতর্ক পাহারাদার সারমেয়গণ, যেমন দেবী রায়ের ডানহাত বসাক, তার ভয় থেকে মুক্ত হতে পারে না, কারণ শ্রেণিশত্রু লিক্যুইডেট করার কাজ শেষ হয় নি।
যুদ্ধ পরিস্থিতি উপন্যাসের নায়ক রণজয় বস্তুত বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার এক এমবডিমেন্ট। তার চেতনায় ভীড় করে ছিল, আছে, চিরকাল থাকবে রুশ বিপ্লব, চীন বিপ্লব, মার্কিন আগ্রাসন ও ন্যাপাম বোমার মুখে ভিয়েতনামের প্রতিবাদী প্রতিরোধ, ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম, নকশালবাড়ির বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, কমরেড লেনিন, কমরেড স্ট্যালিন, কমরেড মাও সে তুং, কমরেড ও শ্রদ্ধেয় নেতা চারু মজুমদার। ভীড় করে আছে অসংখ্য সহযোদ্ধা কমরেড যারা স্বপ্ন দেখেছে, লড়াই করেছে, অত্যাচারিত হয়েছে, শহীদ হয়েছে - বারাসাতে, বেলেঘাটায়, বরানগরে, কাশীপুরে, সন্তোষপুরে, মেদিনীপুরে, মুর্শিদাবাদে, পুলিশ লক আপে, ময়দানে, দিনের আলোয়, রাতের অন্ধকারে। বস্তুতপক্ষে যুদ্ধ পরিস্থিতি উপন্যাসটি একই সঙ্গে সত্তরের উত্তুঙ্গ দিনকালের বিশ্বস্ত দিনলিপি আবার আবহমান বিপ্লবী স্বপ্নের চিরায়ত নির্যাস হিসেবে আমাদের সামনে হাজির থাকে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি উপন্যাসে একটানা কোনও কাহিনী নেই। আছে রণজয় ও তার কাছাকাছি থাকা কিছু মানুষের জীবনের টুকরো টুকরো কিছু কথা। রণজয় এর মধ্য দিয়ে একটি যুদ্ধ পরিস্থিতিকেই আসলে নবারুণ এখানে সামনে এনেছেন। প্রত্যক্ষত নকশালবাড়ি আন্দোলন এই যুদ্ধ পরিস্থিতির কেন্দ্রে, কিন্তু তাকে ঘিরে আছে আরো আরো যুদ্ধ পরিস্থিতি, যার কোনটা রাশিয়ার পেট্রোগ্রাডে, কোনটা চীনে লং মার্চে, কোনটা ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, আবার কোনটা স্পেনে ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদী হামলার বিরুদ্ধে, কোনটা নাৎসি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চলমান। আখ্যানকার নবারুণ ব্যক্তিগতভাবেও যে নকশালবাড়ির বিপ্লবী রাজনীতি দ্বারা কতটা প্রানিত হয়েছিলেন সেটা বিভিন্ন সময়ে নানা সাক্ষাৎকারে খোলাখুলি জানিয়েছেন। ১৯৯৮ এ তথ্যকেন্দ্র পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন সত্তরের আন্দোলন দ্বারা যে আমি প্রভাবিত হয়েছিলাম একথা তো সবাই জানে। আমার রেসপন্সটা কিন্তু ছিল লেখক হিসেবেই। আমার যেটা দায় সেটা আমি লেখা দিয়েই পূরণ করে দিয়েছি। সত্তরের ত্যাগটা যদি আমাদের এখানে কেউ অস্বীকার করে বা ভুলে যায় তাহলে সে খুব অন্যায় কাজ করবে। [নবারুণ ভট্টাচার্যর উপন্যাস সমগ্রর গ্রন্থ পরিচিতি থেকে গৃহীত]
 উপন্যাসের মেরুদণ্ড যুদ্ধ পরিস্থিতি হওয়ায় এখানে স্বাভাবিকভাবেই সশস্ত্র অভ্যুত্থান ও গেরিলা রণনীতি নিয়ে বিস্তৃত বয়ান আছে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের পর্বে বিশেষত প্রথম দিকে চারু মজুমদারের নির্দেশ ছিল ঘরোয়া অস্ত্র ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। কৃষকদের মধ্যে থেকেই বানিয়ে নিতে হবে আর্মড ইউনিট। চেয়ারম্যান মাও শিখিয়েছিলেন অস্ত্র যেন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ না করে, রাজনীতি যেন অস্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মধ্যবিত্ত স্তর থেকে আসা বুদ্ধিজীবী কমরেডদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের দিকে একটা ঝোঁক ছিলই। রণজয় চারু মজুমদারকে বোঝার চেষ্টা করেছে। রাত করে কোনও সভা ? সেখানে গেরিলা অ্যাকশন সম্বন্ধে কমরেড মজুমদারের কথাগুলো বোঝার ও বোঝানোর চেষ্টা করা ? বুদ্ধিজীবী সংগ্রামী হিসেবে সঙ্গে একটা ছোট পিস্তল ছিল ? কিন্তু কমরেড, লড়াই এর এই স্তরে কোনোরকম আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা উচিত নয়। রণজয় কুপির আলোটার দিকে এগোয়। গেরিলা ইউনিটকে সম্পূর্ণভাবে দা, বল্লম, সরকি, কাস্তের ওপর আস্থা রাখতে হবে। না কমরেড, এটা দেশী বন্দুক কেনা বা তৈরি করা বা বন্দুক দখলের পক্ষে উপযুক্ত সময় নয়। হাতে বন্দুক পেলেই কি আমরা দখলে রাখতে পারব ? না। পুলিশ ঠিক ওগুলো দখল করে নেবে। আন্দোলনের পরবর্তী পর্বে রাষ্ট্রের দমননীতির বিরুদ্ধে রণকৌশল বদলাতে হয়। বন্দুক দখল ও ব্যবহারের ওপর জোর পড়ে। ওখানে একটা লোকাল অপারেশন চলছে। তাকে প্রতিহত করতে, কোণঠাসা করতে চূর্ণ করতে দরকার অস্ত্রের। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে চীনা গণমুক্তি ফৌজ ৩২০ টি রাইফেল নিয়ে বিপ্লবী যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আমরা না হয় ৬০ টি রাইফেল আর ২০০ টি পাইপগান নিয়ে আমাদের প্রথম গণমুক্তি ফৌজ তৈরি করব
মাও সে তুং এর গেরিলা যুদ্ধ সম্পর্কিত নির্দেশিকাকে রণজয়ের ভাবনাসূত্রে সরাসরি তুলে এনেছেন নবারুণ। ঘাঁটি এলাকা গড়ে তুলতে হলে প্রথমে চাই একটি স্থায়ী সৈন্যবাহিনী এবং চাই রাজনীতি সচেতন জনতা। এই দুটি শর্ত পালিত হলেই টেরেনের প্রশ্ন আসে। টেরেনের প্রশ্নের দুটি দিক আছে। একটা প্রাকৃতিক এবং অন্যটা নিজেদের হাতে তৈরি করা। সমতলভূমিতে ঘাঁটি এলাকা হতে পারে। তার প্রমাণ জাপ-বিরোধী যুদ্ধের সময় পিকিং শহরের উপকন্ঠে সাতটি এরকম ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল


গ্রামাঞ্চলে কৃষক আন্দোলনের ওপর ভর করেই এগোতে চেয়েছিল নকশালবাড়ির মুক্তিসংগ্রাম, আর তাই ছাত্র যুবদের ডাক দেওয়া হয়েছিল গ্রামে চলো। তরুণ শিক্ষক, ইতিহাসের মেধাবী ছাত্র রণজয় এই ডাকে সারা দিয়েই গিয়েছিল উত্তরবঙ্গে। গিয়েছিল শ্রদ্ধেয় নেতার নির্দেশ মেনে ভূমিহীন কৃষকের সঙ্গে একাত্ম হতে। এরকমই আরো অজস্র নবীন প্রাণ সাথী হয়েছিল রণজয়ের। বাস্তবের এক চরিত্র যাদবপুরের স্নাতকোত্তরের বাংলা বিভাগের ছাত্র, সম্ভবনাময় সাহিত্যিক তিমির বরণ সিংহর কর্মকাণ্ড ও শহীদ হবার প্রসঙ্গ এখানে এনেছেন নবারুণ। এসেছে বাস্তব ও বাস্তবকল্প এরকম আরো অনেক চরিত্র।

বিপ্লবী কর্মকাণ্ডকে শোধনবাদী চিন্তার মোকাবিলা করেই এগোতে হয়, নকশালবাড়ি আন্দোলন ও তার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই দিশা ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনে শুধু নয়, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনেই সতর্কবার্তা হিসেবে বারবার এসেছে। বিভিন্ন প্রসঙ্গে নবারুণ এখানে সেগুলি ছুঁয়ে গিয়েছেন। কমিউনিস্ট শিবিরের মধ্যেকার টু লাইন স্ট্রাগল বস্তুতপক্ষে এখানে জীবন্ত হয়ে উঠেছে এই লড়াইকে রণজয়ের আত্মস্থ করার সূত্রে। রণজয় স্মরণ করে মাও এর সেই অমোঘ উক্তি। বিপ্লব কোনও ভোজসভা নয়। সূচিশিল্প বা প্রবন্ধ রচনা নয়। রণজয় তার পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে জানে বিপ্লবের পথে শ্রেণি শত্রুরা ছাড়াও, মেকি বিপ্লবী ও দালাল গুপ্তচরদের বাধা থাকবেই সেই কাউটস্কি, বার্নস্টাইন থেকে শুরু করে মেনশেভিক, জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, বুখারিন, ট্রটস্কি, লি শাও চি-দের কথা ভুললে চলবে না। ভুললে চলবে না ডাঙ্গেচক্র, নয়া সংশোধনবাদী ও খোকনচক্রের কথা 

তবে রণজয় যাদের শোধনবাদী পণ্ডিত বলেছে, তাদের বই থেকেও প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণের বিষয়ে কোনও ছুৎমার্গ দেখায় নি। ইতিহাসবিদ সুশোভন সরকারের কথা এখানে এসেছে। বস্তুতপক্ষে যুদ্ধ পরিস্থিতির মোকাবিলার এক বিরাট পাঠ প্রস্তুতির তালিকা হাজির করেন নবারুণ। ছেলে কোবা পড়বে এসব বই, প্রস্তুত হবে আগামী এক যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য এমনই ভাবে রণজয়। কোবা বড় হয়ে দুনিয়া কাঁপানো দশদিন পড়বে। চাপায়েভের গল্প পড়বে। ধীরে বহে ডনসাগরে মিলায়ে ডন পড়বে। পড়বে ডাইসন কার্তার এর সোভিয়েত বিজ্ঞান, লিও কিয়াচেলি-র নতুন দিনের আলো, ডিয়ানা লেভিন এর সোভিয়েত রাশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা, দিলীপকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ছোটদের সোভিয়েত, তিন খণ্ডে অমল দাশগুপ্ত, রবীন্দ্র মজুমদার ও অনিল কুমার সিংহের অনুবাদে ১৯৪২ সালের স্ট্যালিন পুরস্কার পাওয়া পারীর পতন, লু সুন, লাও চাও, তিৎ লিঙ ও অন্যান্য পাঁচজনের লেখা এগারোটি গল্প, নীহার দাশগুপ্তের অনুবাদে গোর্কির নবজাতক ...। ছাত্র কৌশিক কে ইতিহাসের তরুণ শিক্ষক রণজয় পাঠক্রমের বাইরে গিয়েই এক ব্যাপ্ত জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, পড়তে দিয়েছিল অনেক বই। রণজয় কৌশিককে একটার পর একটা বই পড়তে দিত। ঘন্টার পর ঘন্টা ওকে যুদ্ধের গল্প, স্তালিনগ্রাদ, লং মার্চ, ভিয়েতনাম, কিউবার মুক্তিযুদ্ধ বর্ণনা করে যেত। রণজয়ের স্মৃতি আর সত্তার মধ্যে সংযোগের উপায় হিসেবে রাস্তা থেকে খুঁজে পাওয়া মানুষটিকে অনেক দিন আগে তারই দেওয়া বইগুলি দেখানোর কথা ভাবে কৌশিক। কৌশিকের মনে হল রণজয়দার সই করা একটা বই নিয়ে গিয়ে বলবে যে বইটা চিনতে পারছে কিনা। যেমন, ভিলহেলম লিবনেখত এর অন দা পলিটিকাল পোজিশন অফ সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসি বা কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের অনুবাদে ক্লারা সেৎকিন এর আমার স্মৃতিতে লেনিন অথবা রিডার্স গাইড টু দা মার্কসিস্ট ক্লাসিকস মরিস কনফোর্থের লরেন্স অ্যান্ড উইশার্ট লিমিটেড, ১৯৫৩ বা গিওর্গি দিমিত্রভেরইউনাইটেড ফ্রন্ট অব দা ওয়ার্কিং ক্লাস এগেন্সট ফ্যাসিজম
একটি বিপ্লব প্রচেষ্টা শত্রুর আক্রমণ ও অন্যান্য কারণে কিছুটা পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এজন্যই যারা নকশালবাড়ি আন্দোলন তথা ভারতে বিপ্লব প্রচেষ্টার পোস্টমর্টেম শুরু করে দিয়েছিলেন, নবারুণ বা তার উপন্যাসের নায়ক রণজয় তাদের বিপ্রতীপ মেরুতে অবস্থান করেন। বাস্তবের মাটিতেও আমরা দেখেছি সত্তরের ব্যর্থতা ও ভুলগুলি থেকে নিজস্ব নিজস্ব বিশ্লেষণ অনুযায়ী শিক্ষা নিয়ে, ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু দৃপ্ত বলিষ্ঠতায় বিপ্লবী গণ আন্দোলনগুলি গড়ে উঠছে, বিহারের আরা ভোজপুরের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত হিন্দি বলয়ে, অন্ধ্রের বারুদ বিস্ফোরিত হচ্ছে আদিবাদী বাসভূমিগুলিতে। গণ আন্দোলনের ঢেউয়ে ঢেউয়ে রাষ্ট্রের দমন পীড়নকে উপেক্ষা করে নকশালবাড়ির শপথকে, তেভাগা তেলেঙ্গানার উত্তরাধিকারকে মনে রাখা হচ্ছে। এজন্য দরকার ছিল সত্তরের ধাক্কার পর সংহত হবার, তৈরি হবার জেদটা। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনকেও এরকম ধাক্কা ও পুনর্গঠনের পর্বের মুখোমুখি হতে হয়েছে। চীনে সাংহাই বিপর্যয়ের পর বা রাশিয়ায় ১৯০৫ এর বিপ্লবী আন্দোলনের সাময়িক স্থিতাবস্থার পর এরকম পরিস্থিতি এসেছিল। পিছু হঠার জন্য নয়, নতুন শুরুর প্রস্তুতির জন্যই বিপ্লবী আন্দোলনে কখনো কখনো োয়ান স্টেপ ফরওয়ার্ড টু স্টেপ ব্যাক জাতীয় কৌশলের দরকার হয়। এই উপন্যাসে লেনিনের শিক্ষাকে সরাসরি সামনে আনা হয়েছে আগামী দিনে রাষ্ট্র ও বিপ্লবের আরেকটি নতুন অধ্যায় লেখার জন্যই। পৃথিবীব্যাপী বিপ্লবের প্রথম জলোচ্ছ্বাস সরে গেছে, দ্বিতীয়টি এখনো ওঠেনি। এ বিষয়ে কোনোরকম বিভ্রম পোষণ করা আমাদের পক্ষে বিপজ্জনক হবে। আমরা সম্রাট জারেক্স নই যিনি সমুদ্রকে শেকল দিয়ে আঘাত করতে আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা পরম্পরাকে এইভাবে বোঝার অর্থ কি চুপ করে বসে থাকা, অর্থাৎ লড়াই পরিত্যাগ করা ? ... আমাদের তৈরি হতে হবে, খুব ভালো করে তৈরি হতে হবে যাতে ভবিষ্যতে বিপ্লবের ঢেউ এলে তাকে সজ্ঞানে ও সবলে সম্যকভাবে কাজে লাগাতে পারি