চলে গেলেন বাদল সরকার। ১৩ মে, ২০১১, ৮৬ বছর বয়েসে। বাংলা তথা ভারতীয় নাটকের কিংবদন্তী এই নাট্যব্যক্তিত্ত্ব প্রথম জীবনে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের সাড়া জাগানো নাট্যকার হিসেবে খ্যাতির চূড়ায় উঠেছিলেন। ষাটের দশকের কৌতুক নাটক ও অ্যাবসার্ড নাটক রচনার সেই পর্ব পেরিয়ে নতুন এক পর্বর সূচনা হয় সত্তর দশকে। সত্তর দশকের উত্তাল সময়ের শুরু থেকে ‘থার্ড থিয়েটার’ নামক ভিন্ন এক নাট্য আঙ্গিক ও দর্শনের এর উদগাতা, নাটককার, সংগঠক, পরিচালকের ভূমিকাতে পরবর্তী চার দশক ধরে নাট্যজগৎ তাঁকে দেখেছে। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের বর্ণময় নাট্যজীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন বিজয় তেণ্ডুলকর, গিরিশ কারনাড, হাবিব তনবীরের পাশাপাশি ভারতীয় নাটকের এক বিশিষ্ট স্তম্ভ।
বাদল সরকারের জন্ম হয়েছিল ১৫ জুলাই ১৯২৫। শিবপুর মহাবিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করে প্রথমে মাইথনে পরে কলকাতায় চাকরি করেন। ১৯৫৭-৫৯ লন্ডনে ও ৬৩-৬৪ সালে ফ্রান্সে থাকার সময় প্রচুর ইউরোপীয় থিয়েটার দেখার সুযোগ পান। এরপর নাইজেরিয়ায় কর্মসূত্রে থাকার সময় অনেকগুলো নাটক লেখেন। ১৯৬৭ সাল থেকে টাউন প্ল্যানিং এর চাকরী নিয়ে কলকাতায় স্থায়ীভাবে থাকতে শুরু করেন। বরাবরের ঠিকানা ছিল মানিকতলা মোড়ের কাছে বিডন স্ট্রিট এর বাড়ি। বয়সকালে সবাইকে চমকে দিয়ে হঠাৎ ভর্তি হন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে, এখানে তুলনামূলক সাহিত্যে এম এ পড়েন বৃদ্ধ বয়সেই। নাটক লেখা, প্রযোজনার কাজ ছাড়াও দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়ানোতে অদম্য উৎসাহ ছিল। বিশ্বভাষা ‘এস্পারেন্তো’ নিয়ে ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ, এ নিয়ে কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি। শেষ কয়েক বছরে আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘পুরানো কাসুন্দী’ তে বিস্তারিতভাবে নাটক দেখা, করা, নাটক নিয়ে নানা ভাবনা চিন্তার কথা সরস ভাবে লিখে গেছেন।
সরসতা বাদলবাবুর জীবন ও রচনার একটা খুব বড়ো দিক। তাঁর প্রথম দিকের নাটকগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই কৌতুক নাটক। রঙ্গনাট্য সঙ্কলন নামে সেগুলি সঙ্কলিত হয়েছিল। বড়ো পিসিমা, সলিউসন এক্স, রাম শ্যাম যদু, বল্লভপুরের রূপকথা – বাংলা কৌতুক নাটকে অতি বিশিষ্ট সংযোজন। এই নাটকগুলোর প্রেরণা হিসেবে অবশ্য কাজ করেছে কোন কোন বিদেশি নাটক বা চলচ্চিত্র। এর পর বাদলবাবু লিখলেন সারারাত্তির এবং তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো নাটক ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ – আধুনিক ভারতীয় নাটকের অন্যতম মাইলস্টোন। ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ ১৯৬৩ তে লেখা, যখন চিন ভারত যুদ্ধ আর কমিউনিষ্ট পার্টির মধ্যে আন্তঃপার্টি সংগ্রাম চলছে, কিছুদিন যে পার্টির সদস্য ছিলেন তিনি নিজেও। বাদলবাবু লিখছেন, “হাসাবার ক্ষমতা চলে যাচ্ছে আমার। ... আজগুবি সৃষ্টিছাড়া হয়ে উঠছে লেখা। আর সবচেয়ে মারাত্মক – এতো রূপক এতো আড়াল সত্ত্বেও সত্যি মানুষগুলো বড় বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’’ ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ একটা সময়ের দ্বিধা দোলাচলতাকে ধারণ করে থাকে। অমল বিমল কমল এর গতানুগতিকতার বাইরে দাঁড়িয়ে ইন্দ্রজিৎ কোন হিসাব খুঁজে পায়না জীবনের, কোন হিসাব মেলাতেও পারে না।
প্রসেনিয়াম মঞ্চে বাদলবাবুর নাটককার হিসেবে তীব্র সাফল্য যখন তৈরি হচ্ছে ‘সারারাত্তির’, ‘এবং ইন্দ্রিজিৎ’, ‘বাকি ইতিহাস’, ‘প্রলাপ’, ‘ত্রিংশ শতাব্দী’, ‘পাগলা ঘোড়া’র মতো নাটকগুলির মধ্য দিয়ে সাত আট বছরের সময়কালের মধ্যে, তখনই তিনি প্রসেনিয়াম থিয়েটার ছেড়ে সরে আসছেন মানুষের সঙ্গে নাটকের আরো বেশি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। শুরু হচ্ছে থার্ড থিয়েটার বা অঙ্গনমঞ্চের নাটকের পথ চলা। বাংলার রাজনীতিতে তখন নকশালবাড়ির বিপ্লবী রাজনীতির আবেগ, সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করার স্বপ্ন, কৃষক শ্রমিকের সাথে একাত্ম হবার প্রেরণা। বাদলবাবুর মনে হল গ্রামীণ যাত্রা বা ফার্স্ট থিয়েটার বা ইউরোপীয় আদলের সেকেণ্ড থিয়েটার – উভয় নাট্যমাধ্যমেই দর্শকের সাথে নাটকের অনেক দূরত্ব থেকে যাচ্ছে। এখানে অভিনেতারা থাকেন আলোকবৃত্তের মধ্যে, আর দর্শকরা অন্ধকারে। তারা বসেন মঞ্চ থেকে নিচুতে ভিন্ন এক তলে। থিয়েটার থাকে প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে আবদ্ধ। শ্রমিকের কারখানায়, কৃষকের মাঠে ময়দানে, হাটে বাজারে জনতার মাঝে প্রচলিত থিয়েটারকে নিয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। থিয়েটারের এই সীমাবদ্ধতা ভাঙতে হবে। পেক্ষাগৃহে দর্শককে ডাকলেই শুধু চলবে না, কারণ থিয়েটার বিনোদনমাত্র নয়। থিয়েটারের মাধ্যমে চিন্তার রাজনীতিকে ছড়িয়ে দিতে হলে দর্শক আর নাটকের যোগাযোগকে অনেক জীবন্ত আর প্রত্যক্ষ করতে হবে। প্রথমদিকে বদ্ধ ঘরের অঙ্গনেই থার্ড থিয়েটারের কাজ বাদলবাবুর নাট্যদল ‘শতাব্দী’ শুরু করলেও পরে খোলা মাঠে অভিনয় শুরু হয়। আশির দশকে গ্রাম পরিক্রমার মধ্য দিয়ে শহর মফস্বলে আটকা থাকা নাট্যচর্চার পরিধিকে প্রত্যন্ত গ্রামেও ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। সেট আলোর উপকরণগুলিকে থার্ড থিয়েটার দর্শকের সাথে প্রত্যক্ষ সংযোগে অনাবশ্যক বলে মনে করে, অভিনয়ে শরীর, কন্ঠকে নানাভাবে ব্যবহার করে তাকে জীবন্ত করার ভাবনায় এই নাট্যকলা উদ্বুদ্ধ। ব্যয়বহুল উপকরণের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার ফলেই এই থিয়েটার করা সম্ভবপর হয়ে উঠেছে সস্তায়, কোন টিকিট বিক্রি, বেসরকারী বা সরকারী অনুদানের ওপর নির্ভর না করে। থার্ড থিয়েটার এই অর্থে হয়ে উঠতে পেরেছে ‘ফ্রি থিয়েটার’ও। কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত না থেকেও মেহনতি সাধারণ মানুষের সঙ্কট আর লড়াইয়ের কথাকে বারবার তুলে এনে এই থিয়েটার ‘থিয়েটারের এক নতুন রাজনৈতিক দর্শন’ তৈরি করতে পেরেছে।
থার্ড থিয়েটারের জন্যই লেখা হয়েছে সত্তর দশক ও তার পরবর্তী বাদলবাবুর বিখ্যাত নাটকগুলো। সাগিনা মাহাতো, স্পার্টাকুস, মিছিল, ভোমা, সুখপাঠ্য ভারতের ইতিহাস, হট্টমালার ওপারে, গণ্ডী, একটি হত্যার নাট্যকথা, নদীতে - এরা কোথাও প্রচলিত রাজনৈতিক আধিপত্যর তীব্র সমালোচনাতে উচ্চকিত, কোথাও মানুষের দাঁতে দাঁত চাপা লড়াইয়ের সঙ্গী, কোথাও নতুন মানবিক সাম্য সমাজ প্রতিষ্ঠার মরমী স্বপ্নে বিভোর। বাংলা তথা ভারতীয় থিয়েটার তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধরদের অন্যতম হিসেবেই বাদলবাবুকে মনে রাখবে।
No comments:
Post a Comment