যে বাংলার সমাজে
মেয়েদের বিয়ে হয় এবং ছেলেরা বিয়ে করে, সেই সমাজের গল্পে উপন্যাসে কন্যাদায় যে
বারবার ঘুরে ফিরে আসবে, তা নতুন কোনও কথা নয়। প্রাক ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যে
বাঙালি মা বাবার স্বামী সংসারে থাকা কন্যার জন্য নিরন্তর দুশ্চিন্তার আখ্যান আমরা
শাক্ত পদাবলীগুলির মধ্যে পেয়েছি। আগমনী বিজয়া পর্যায়ের হিমালয় মেনকা উমা শিবকে
নিয়ে লেখা পদগুলি মূলত বাঙালি পারিবারিক চিত্রের আদলকেই ফুটিয়ে তুলেছে। তবে
কন্যাদায়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ পিতামাতার ছবিটি উপনিবেশ পর্বের আখ্যানেই বেশি করে ধরা
দিয়েছে। মেয়ে দেখতে যাওয়া ও বিয়ের ব্যাপারে খামখেয়ালের নজির বঙ্কিমে তেমন না
থাকলেও এই প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথের বেশ কিছু আখ্যানে ঘুরে ফিরে এসেছে। ছোটগল্প রচনার
প্রথম পর্বটিতেই তিনি লিখে ফেলেছিলেন সুপরিচিত “দেনাপাওনা”। ‘এবারে বিশ হাজার টাকা পণ এবং হাতে হাতে আদায়’ – গল্পের শেষ বাক্যটির অনিঃশেষ
লাঞ্ছনা বাঙালি পাঠকের স্মৃতিতে অক্ষয় হয়ে আছে। নিরুপমা ও তার পিতার অসহয়তার বেদনা
বাঙালি সমাজের এক বিশিষ্ট ক্ষতকেই তুলে ধরেছিল। এর পরে তিনি যখন চোখের বালির মধ্যে
দিয়ে উপন্যাস সাহিত্যের অঙ্গনে দৃপ্ত পদচারণা শুরু করলেন, তখন বিবাহকে কেন্দ্র করে
পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতা ও কন্যাপক্ষের করুণ দায়ভাগ বেশ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠল।
মহেন্দ্র বিনোদিনী ও আশা উভয়কেই বিয়ে করা এবং না করার সিদ্ধান্ত এখানে বেশ
খেলাচ্ছলেই নেয় এবং ইচ্ছামত তা পরিবর্তন করে। বিপরীতে বিনোদিনী বা আশার মহেন্দ্রর
সাথে বিবাহ হয় বা হয় না এবং সেটা তাদের পরবর্তী জীবনের নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। চোখের
বালি অবশ্য এই কারণেই বিশিষ্ট এবং শতবর্ষ পেরিয়ে এসেও এখনো আকর্ষণীয়, কারণ এর
নায়িকা বিনোদিনী নেহাত বিধবার করুণ জীবন কাটানোর বিধিলিপিকে না মেনে নিজের জীবন
তৃষ্ণাকে মেলে ধরে। বিবাহের মধ্যে দিয়ে সংসারে ও জীবন যৌবনে তার প্রতিষ্ঠার
সম্ভাবনাকে রবীন্দ্রনাথ শেষপর্যন্ত স্বীকার করে না নিয়ে তাকে কাশীবাসী করেন ঠিকই,
কিন্তু নীতিবাদের কাছে শিল্পের ন্যায়ের এই পরাজয়ের আলোচনাকে বিনোদিনী উন্মুক্ত করে
দিয়ে যায়।
বিবাহের নির্বাচন ও
প্রত্যাখ্যান পুরুষের দিক থেকেই হবার প্রচলিত সমাজরীতিটি সেভাবে ভাঙার আগেই
সাহিত্যের আঙিনায় তাকে অবশ্য প্রশ্ন করতে এবং ভাঙতে উদ্যত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
শেষের কবিতায় চয়নের প্রশ্নটি ও বিবাহে নারী পুরুষের সাম্যের জায়গাটি নানাভাবে
আলোচিত হয়েছে। বস্তুত সে আলোচনাই উপন্যাসটির প্রাণধর্ম। তিনসঙ্গীর গল্পগুলিতে,
যেমন ল্যাবরেটরি বা রবিবার এ এই নিয়ে আরো নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা আলাপ আলোচনা
চালিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
রবীন্দ্রনাথ যুগধর্মের
নতুন যে প্রশ্নগুলিকে সমাজের প্রচলিত গতির দিক থেকে খানিকটা এগিয়েই সাহিত্যে জায়গা
করে দেন, নারীর অধিকারের প্রশ্নে যথেষ্ট দরদী বলে স্বীকৃত শরৎচন্দ্রে তা কিন্তু
আমরা সেভাবে পাই না। অরক্ষণীয়ার মত গল্প শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার অন্যতম চাবিকাঠি।
অতুলের হাতে নিজ কন্যাকে সমর্পণ করে তার ভবিষ্যতকে সুনিশ্চিত করাই দুর্গামণির
জীবনের মূল কামনা। সেই সম্ভাবনা নানা পাকেচক্রে যত অন্তর্হিত হয় আমরা তাকে ততই
হতোদ্যম, বেদনাবিধূর ও ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে দেখি। আবার তার প্রত্যাবর্তনেই কেবল তিনি
শান্তিতে চোখ বুজবার রসদ পান।
একদিক থেকে দেখলে
শরৎচন্দ্রের অরক্ষণীয়ার সাথে প্রেমেন্দ্র মিত্রের তেলেনাপোতা আবিস্কারের বেশ কিছু
মূল আছে। কিন্তু এ মিল মূলত বহিরঙ্গের মিল। শরৎচন্দ্র মূলত সামাজিক স্থিতাবস্থাটির
আবেগদীপ্ত ভাষ্যকার। অন্যদিকে প্রেমেন্দ্র মিত্র অনুচ্চকিত আখ্যান ভঙ্গীমায় আধুনিক
নাগরিক জীবনের স্থিতাবস্থাটিকে বিদ্রুপ করেন। গল্পের অনামা যুবকের প্রতিশ্রুতিদান
ও প্রতিশ্রুতিভঙ্গই এই আখ্যানটির অন্তিম ও পরম মোচড়।
No comments:
Post a Comment