Thursday, September 27, 2018

ভোগীর সীমাবদ্ধতা থেকে ফ্যাতাড়ুর উৎসমুখে


রচনাকালের দিক থেকে নবারুণের দুটি মেজর নভেলের, ‘হারবার্ট’ ও ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’র মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ‘ভোগী’। হারবার্ট প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯২ এ প্রমা পত্রিকার শারদ সংখ্যায়। তার পরের বছর ১৯৯৩ তে বারোমাস পত্রিকার শারদসংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘ভোগী’। এর দুবছর পর ১৯৯৫ এর ‘প্রতিক্ষণ’ পত্রিকার শারদসংখ্যায় আত্মপ্রকাশ করে ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’। ‘হারবার্ট’ নিয়ে সমকালীন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে বিপুল আলোড়নের কথা আমরা জানি, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ নিয়েও উতরোল কম হয় নি এবং তাকে নিয়ে বিশিষ্ট থিয়েটার গ্রুপ মঞ্চসফল নাটকও করেছেন। তুলনায় ‘ভোগী’ যেন খানিকটা নিষ্প্রভ। শুধু যে আমাদের মতো পাঠকদের কাছে এটা মনে হয়েছে তা নয়, কথাকার নবারুণেরও সম্ভবত তাই মনে হয়েছিল। আমরা তো লক্ষ্যই করি গ্রন্থ হিসেবে ‘ভোগী’র আত্মপ্রকাশ যথেষ্ট বিলম্বিত। ১৯৯২ এ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘হারবার্ট’ ১৯৯৩ এই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হচ্ছে, ১৯৯৫ এ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ও তার ঠিক পরের বছরেই ১৯৯৬ সালে বইয়ের চেহারা নিচ্ছে। কিন্তু ১৯৯৩ এ পত্রিকায় শারদসংখ্যায় প্রকাশের পর দীর্ঘদিন ‘ভোগী’ আর গ্রন্থাকারে আত্মপ্রকাশ করে নি, অবশেষে প্রায় দেড় দশকের ব্যবধান পেরিয়ে অন্য একটি উপন্যাস ‘অটো’কে সঙ্গে নিয়ে সে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালে। নবারুণ তাঁর বিভিন্ন আত্মকথনেও এ সংক্রান্ত তাঁর ভাবনাচিন্তা ব্যক্ত করেছিলেন। উপন্যাসটি প্রকাশের পরের বছরেই নবারুণ দেবেশ রায়ের সঙ্গে এক কথোপকথনে (মে ১৯৯৪, প্রতিক্ষণ পত্রিকায় প্রকাশিত) জানিয়েছিলেন, “ভোগীর বর্তমান গঠনে আমি খুশি নই, সেটা আমি বদলাব। ...কেউ না দেখলে বানাতে পারবে না। আবার বানানোরও একটা জায়গা আছে। আমার মনে হয়েছে ভোগীতে সেই বানানোর দুর্বলতাই ঘটেছে।” আমরা জানি ইপ্সিত বদলের সেই সুযোগটা নবারুণ আর পান নি বা নিতে চান নি ভিন্ন কোনও কারণে। পত্রিকায় প্রকাশের চোদ্দ বছর পর ভোগী অপরিবর্তিতভাবেই গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। তখনো অবশ্য ভোগীকে নিয়ে অতৃপ্তির ব্যাপারটা ছিলই। ‘অটো’ ও ‘ভোগী’ একত্রে প্রকাশের মুখবন্ধে নবারুণ লিখেছিলেন, “ দুটি লেখাই আমার নিজের প্রিয়। অনেকের নয়। কেউ কেউ বলেছে যে লেখাদুটিকে বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে বইবন্দি করার সুবাদে ফিরে পড়তে গিয়ে মনে হল সেটা ঠিক হবে না। টেনে বাড়িয়ে দুর্বলতা ঢাকা যাবে না, খুব একটা সঙ্গতও মনে হচ্ছে না।”
‘ভোগী’ কে নিয়ে লেখক পাঠকের এই যে অতৃপ্তি কোথায় তার উৎস ? সেই উত্তরটা এখানে খুঁজতে চাইবো আমরা। আমাদের মনে হয়েছে শুধু ‘ভোগী’ বা তার দুর্বলতাকে বোঝার জন্য নয়, নবারুণ এর কথনবিশ্বের একটা সূত্র আবিষ্কার করতে এই সন্ধানের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে।
আমরা যারা নবারুণের বিভিন্ন লেখার আগ্রহী পাঠক তারা জানি নবারুণ একটা নির্দিষ্ট বিশ্বাসের জায়গা থেকে লেখেন। হারবার্ট সংক্রান্ত প্রথম আলোচনায় আমরা সে প্রসঙ্গকে এনেছিলাম, এবার আবার তাকে একটু মনে করি। নিজের লেখা সম্পর্কে তাঁর সেই অমোঘ উক্তি, "আমি লেখার ব্যাপারটা যেভাবে বুঝি সেটা নিছক আনন্দ দেওয়া বা নেওয়া নয়। আরো গভীর এক অ্যালকেমি যেখানে বিস্ফোরণের ঝুঁকি রয়েছে।"আমরা জানি একটা বিকল্প রণনীতি ছিল তাঁর সুখপাঠ্য আখ্যান থেকে নিজের লেখাকে পৃথক করার। একটা গভীর বিশ্বাস থেকে সেই রণনীতি তৈরি হয়েছিল। "পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্টের মৃত্যু হলেও ... সারা দুনিয়া জুড়ে কমিউনিস্টরা ফিরে আসবে। হ্যাঁ আসবে।তবে তার জন্যে আগামী সতেরো বছর বা তারও বেশি সময়ের প্রত্যেকটি ঘণ্টা ও প্রত্যেকটা মিনিট কাজে লাগাতে হবে। সারা পৃথিবী জুড়ে কমিউনিস্টরা ফিরে আসবে। আসবেই। আর দশ নয়, দশ হাজার দিন ধরে দুনিয়া কাঁপবে।" সাহিত্যের কোন ভূমিকা পালনের জন্য নবারুণ কলম ধরেছিলেন তা জানিয়ে একটি গল্প সংকলনের ভূমিকায় তিনি বলেছিলেন, " মানুষের এগিয়ে চলার, শোষণমুক্তি ও সমাজব্যবস্থা পাল্টানোর মডেল, পুঁজি ও প্রতিক্রিয়ার আঘাতে ও বামপন্থীদের আবশ্যিক আত্মসমীক্ষার অভাবের কারণে অনেকটাই তছনছ হয়ে গেছে। যে শতক সবচেয়ে আশা জাগিয়েছিল সেই শতক শেষ হচ্ছে অবসাদে বিষাদে যন্ত্রণাজর্জর অবস্থায়। আমি দৈনন্দিনতায়, প্রত্যহ নিকটে ও দূরে, নিয়ত যা দেখতে পাই তা হল পরতে পরতে স্তরে স্তরে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন বর্গের ওপর চাপিয়ে দেওয়া শোষণ, নতুনতর ঔপনিবেশিকতা ও সংস্কৃতি সাম্রাজ্যবাদের অমানুষীকরণের দেখা না দেখা হাতকড়া ও চোখভুলোনো ঠুলির ভার। সামন্ততন্ত্র বা পুঁজিবাদের বালক বয়সের প্রত্যক্ষ নিষ্ঠুরতার চেয়েও এ যেন অধিকতর মারাত্মক, জঘন্য ও অপমানজনক। এই দলিত মথিত মানুষ ও তাদের জীবনের এক বিচিত্র ক্যালেইডোস্কোপের মধ্যে আমার জীবন কাটছে। চারপাশে তাই আমি দেখি। কিন্তু চূড়ান্ত নিরিখে এই বাস্তবকে আমি চিরস্থায়ী বলে মানি না। বাস্তবকে পাল্টাতে হবে। হবেই। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় চেতনা তৈরি করার ক্ষেত্রে সাহিত্যের অবশ্যই একটি বিশিষ্ট ভূমিকা রয়েছে"
নবারুণের আখ্যানগুলির মুখোমুখি হয়ে আমরা দেখি নবারুণ এর বিভিন্ন লেখায় সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন, সোভিয়েত সমাজবাদের মডেলটির পতন, বিশ্বজুড়ে লুঠেরা পুঁজির অপ্রতিহত গতি ও তাকে লাগাম পড়ানোর চিন্তাভাবনা তথা পথসন্ধান পুনরাবৃত্ত এষণা বা রেকারেন্ট মোটিফ হিসেবে ঘুরেফিরে আসছে। ৮৯ এ পূর্ব ইউরোপ ও সোভিয়েত সমাজবাদের পতনের পর থেকেই নবারুণের উপন্যাসগুলি আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক এবং ভারতীয় রাজনীতির পরিবর্তন, সমাজের পরিবর্তনকে নবারুণ যেমন তাঁর উপন্যাসে আনতে থাকেন, তেমনি এর মোকাবিলা করার রণনীতিও খুঁজতে থাকেন। ‘ভোগী’র আগে পরে যে দুটি উপন্যাস লেখা হয়েছিল, সেই ‘হারবার্ট’ বা ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ তে এই মোকাবিলার জন্য নবারুণ বেছে নিয়েছিলেন আড়াই দশক আগের এক আলোড়ন তোলা বিপ্লবপ্রচেষ্টাকে, যার রেশ তখনো এখনো এবং সম্ভবত আরো দীর্ঘ দীর্ঘদিন স্বপ্ন দেখার মহড়া হিসেবে উজ্জ্বল থাকবে। পাঠক বুঝতে পারছেন আমরা নকশালবাড়ি আন্দোলনের কথাই বলছি। ‘হারবার্টে’র বিনু বা ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’র রণজয় নকশালবাড়ি আন্দোলনের মানুষ। তাদের ঘিরে নবারুণ রাষ্ট্র এবং এই শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কামান দাগার এক তৈরি ডিসকোর্সকে পেয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানকে মোকাবিলা করার একটা ভিন্ন দায় কমিটেড লেখকের থাকবেই এবং নবারুণ সেই দায় গ্রহণও করেছেন।
২০০৭ এ রচনার দেড় দশক পর গ্রন্থ প্রকাশকালে ‘ভোগী’র মুখবন্ধে নবারুণ জানিয়েছিলেন, “একই ধাঁচের লিখতে যে আমার ভালো লাগে না, ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তির মুন্সিয়ানা যে আমার নেই, সেটা বোধহয় আমার পাঠকেরা এতদিনে জেনে ফেলেছে।” আমাদের মনে হয় হারবার্ট এর পর নবারুণ ভাবতে চেয়েছিলেন নকশালবাড়ির ব্যবহৃত অনুষঙ্গর বাইরে গিয়ে সমকালের প্রতিক্রিয়ার মোকাবিলা কীভাবে করা যেতে পারে। মোকাবিলার আকাঙ্ক্ষাটা ভোগীতে নিঃসন্দেহে স্পষ্ট ও সরাসরি। আমরা দুটি উদ্ধৃতির দিকে খেয়াল করবো –
১.
“আর এক রাউন্ড গ্লোবাল লড়াই হবে। ক্যাপিটালের সঙ্গে হিউম্যানিটির লড়াই। মার্কসবাদ নামক শর্ট লিভড রিলিজিয়নটি যা পারল না। ডু ইউ নো একসময় – যখন এস এফ করতাম তখন ওঃ কত স্বপ্ন ছিল ... দুনিয়াটা কে চালাচ্ছে বলতো ? ক্লিন্টন, কোল, মেজর, নাকি ওই জাপানি লিডারগুলো – ইমপসবলস নেমস ? ওরা ঘেঁচু । দুনিয়াটা চালাচ্ছে – জি এম, আই বি এম, পেপসিকো, জেনারেল ইলেকট্রিক, কাইজার, শেল, ফোকসভাগেন, এক্সস্কন, - এরকম কয়েকশো মাল্টিন্যাশানালস। ভাবতে পারিস ফার্স্ট ইন্টারন্যাশানাল সিটি কর্পোরেশনের প্রেসিডেন্ট বলছে, ‘কনজিউমার ডেমক্রেসি ইজ মোর ইমপর্টান্ট দ্যান পলিটিকাল ডেমক্রেসি। ... দুনিয়ার মানুষ মেনে নেবে ? ছিঃ ভাবা যায় না। ... লড়বে। না পারলে মরে যাবে। ইন প্রেটেস্ট মরে যাওয়াও ইজ্জতের”।
২.
“রজতদার সঙ্গে তখন আই এস আই এর অর্থনীতির অধ্যাপক পুরুষোত্তম চ্যাটার্জির জোর তর্ক চলেছে। পুরুষোত্তম করেছেন কি রবিন ব্ল্যাকবার্ন সম্পাদিত ‘আফটার দা ফল – দা ফেলিওর অফ কমিউনিজম অ্যান্ড দা ফিউচার অব সোশালিজম’ বইটি পড়েছেন এবং সবিশেষ প্রভাবিত হয়েছেন। বিশেষত এরিক হবসবম, ফ্রেডরিক জেমসন এবং র‍্যালফ মিলিব্যান্ডের লেখাগুলো তাঁকে ভাবাচ্ছে। এর কোনও কিছুই রজতদাকে ইমপ্রেস করে নি।
-  দ্যাখো পুরুষোত্তম, আমার সহজ কথাটা হল এই নিউ লেফট মার্কা অ্যানালিসিসগুলো আমি মেনে নিতে পারি না – বলতে পারো যে সেটা আমার লিমিটেশন – যাই হোক আমার কথা হল তুমি যেটাকে বলছ ফেলিওর আমি সেটাকেই বলছি বিট্রেয়াল। ভুলচুক কটা হয়েছে ? হ্যাঁ, একসময়ে মনে হয়েছে গাইড টু অ্যাকশানের বদলে ডগমার দিকে পাল্লা ভারি। সো হোয়াট! কমরেড স্তালিন বা কমরেড মাও তো আর আর্মচেয়ার থিওরেটিশিয়ান ছিলেন না, তাঁদের এত বড় বড় কাজ করতে হয়েছিল – তাতে একটু আধটু গলদ থাকতেই পারে –
-  কিন্তু সেটা ঠিক থাকলে এরকম হাম্পটি ডাম্পটি শো হতো না রজতদা।
-  তাহলে চায়নাতে হল না কেন ? ভিয়েতনাম, কোরিয়া, কিউবা কী করে লড়ে গেল। দ্যাখো, ফান্ডামেন্টাল টেনেটস বলতে আমরা যা বুঝি – ওয়ার্কিং ক্লাসের ফিলজফিক্যাল আউটলুক, ডায়ালেক্টিকাল অ্যান্ড হিস্টরিকাল মেটেরিয়লিজম, মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট পলিটিকাল ইকনমি, ক্লাস স্ট্রাগেল, যেটা মোটিভ ফোর্স, তারপর শ্রমজীবী মানুষের স্টেট, শ্রমিক শ্রেণির পার্টি গড়ার প্রয়োজনিয়তা – ক্যাপিটালিজম থেকে সোসালিজম হয়ে কমিউনিজম – এর একটাও ইনভ্যালিড নয় -”
আমাদের মনে হয় ‘ভোগী’তে যে বিষয়টা কেন্দ্রে রেখে উপন্যাসটা তৈরি করতে চেয়েছিলেন নবারুণ, সেই কনজিউমারিজম এবং তার মোকাবিলা –‘কনজিউমার ডেমক্রেসি ইজ মোর ইমপর্টান্ট দ্যান পলিটিকাল ডেমক্রেসি’ এই ভাববিশ্বের মোকাবিলা - সেটার জন্য উপযুক্ত আবহ তিনি খুঁজে পান নি। ‘ভোগী’র মত খানিকটা দুর্গেয় রহস্যময়, খানিকটা সাধু ধরণের চরিত্রকে দিয়ে আধুনিক বিশ্বজনীন কনজিউমারিজম এর মোকাবিলা সম্ভব কিনা সেটার চেয়েও বেশি গুরূত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল ভোগীকে, তার আদর্শটাকে, লড়াইটাকে সেভাবে উপন্যাসে এস্টাবলিস্ট করা গেল কিনা। আমাদের মনে হয় এখানেই উপন্যাসের নান্দনিক সমস্যার মূল উৎসটি নিহিত রয়েছে। পলিটিক্যাল নভেল হিসেবে ভোগীর সীমাবদ্ধতা আর নভেল হিসেবে তার দুর্বলতা আলাদা কোনও বিষয় নয়, তা অঙ্গাঙ্গী যুক্ত।
ভোগী একদিকে গ্রাম থেকে শহর দেখতে আসা এক মধ্যবয়স্ক মানুষ যে খোলা এবং ভিন্ন চোখে শহর ও তার সামাজিকতাকে দেখতে থাকে। আবার এই ভোগীর মধ্যেই অতীত ভবিষ্যৎ বর্ণনার মতো কিছু অতিলৌকিক ক্ষমতাও যুক্ত করেন নবারুণ। যদিও এই অতিলৌকিক ক্ষমতা খানিকটা হস্তরেখা বিশারদদের মতো ব্যক্তিগত ভাগ্যগণনাতেই সীমায়িত থেকে যায়, বঙ্কিমের আনন্দমঠের সত্যানন্দের মতো দেশকাল ভাবনার কোনও দার্শনিক উচ্চতা তাতে নেই। ফলে উপন্যাসের রাজনৈতিক বয়ান এ ভোগী কোনও সন্দর্ভ সংযোজন করে না। রজত পুরুষোত্তমের রাজনৈতিক ডিসকোর্স সংক্রান্ত যে কথোপকথনটি আমরা উদ্ধৃত করেছি, সেটি চলার সময় ভোগীও সেখানে উপস্থিত ছিল কিন্তু আগাগোড়া নীরব শ্রোতার ভূমিকা নিয়েই। আসলে সে কতটা কনজিউমারিজম এর অ্যান্টিডোট আর কতটা উপন্যাস বর্ণিত ‘এখন যেটা চলছে মিথিল যেটাকে বলে এথনিক ফেজ’ তার একটা রোমান্সভিত্তিক অনুসন্ধান – সেটা নিয়েই সংশয় জাগে।
উপন্যাসের প্রথম দিকে যখন ভোগীকে পরিচয় করানো হচ্ছে পাঠকের সঙ্গে তখন মিথিলের তথাকথিত এথনিক ফেজের ‘প্রধান গাইডদের অন্যতম’ অভিমান্য মিথিলকে জানিয়েছিল – ‘ ভোগী কে জান তো ? সে করে কি তোমার কয়েকদিন মাত্তর থাকে। এর মধ্যে ভোগ করে। তারপর বলি হয়ে মরে যায়।
-  মরে যায় ? কেন ?
-  কেন আবার কি। চারিদিকে এত অনাচার, অত্যাচার, ধম্মলোপ, খুন-খারাপি, চোপরদিন চুরিচামারি – এই অনাসৃষ্টি দূর করার জন্যই ভোগী আসে, তারপর যা বললাম – আত্মঘাতী হয়।’
আখ্যানে আমরা পরে দেখেছি ভোগী সত্যই আত্মঘাতী হল, কিন্তু অনাসৃষ্টি দূর করার সঙ্গে তার সম্পর্কটি, যেটি সম্ভবত এই উপন্যাস লেখায় নবারুণকে প্রণোদিত করে থাকবে, শেষপর্যন্ত স্থাপিত হলো না। এমনকী গোটা আখ্যানটিকে শেষ পরিচ্ছেদে হঠাৎ একটা ফিল্ম উইথইন এ টেক্সট হিসেবে দেখিয়েও এর কোনও সমাধান করা গেল না। অভিমান্য বলেছিল ‘ভোগী যে সে হয় না। আবার যে কেউ হতি পারে। কে হবে সে এক গূঢ় রহস্য।’ উপন্যাসের কারণেই এই রহস্য উন্মোচনের দায় ছিল কিন্তু শেষপর্যন্ত উপন্যাসে এ রহস্য ভেদ হয়নি এবং উপন্যাসের নান্দনিক আবেদনকে তা নিঃসন্দেহে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে।
‘ভোগী’র সীমাবদ্ধতা নিয়ে নবারুণ অবশ্যই ভেবেছেন এবং তার প্রকাশ্য কিছু স্বীকৃতি আমরা লক্ষ্যও করেছি। কিন্তু ‘ভোগী’কে পুনর্লিখনের মধ্য দিয়ে নবারুণ এই সীমাবদ্ধতার মোকাবিলা করলেন কিনা সেটা শেষ পর্যন্ত ততটা গুরূত্বপূর্ণ থাকে নি। কারণ পরবর্তী আখ্যানসমূহতে ‘ভোগী’তে উদ্ভূত সমস্যার মোকাবিলা করার কথা নবারুণ ভেবেছেন। পরবর্তী উপন্যাস ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ নান্দনিক সাফল্য পেয়েছে, কিন্তু সেটাই সর্বোচ্চ সিদ্ধি ছিল না। কারণ এখানেও হারবার্টের মতোই আবারো ‘নকশালবাড়ি’ অনুষঙ্গটিকে ঘিরেই সমকালীন প্রতিক্রিয়ার মোকাবিলা করতে হয়েছে আখ্যানকারকে। নবারুণ অবশ্যই চাইছিলেন অতীতের গৌরবের সমস্ত প্রেরণা নিয়েই সমকালকে মোকাবিলা করার জন্য সমকালীন প্রেক্ষাপটের কোনও চরিত্র।  প্রথম ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত উপন্যাস ‘কাঙাল মালসাট’ এই সেই অনন্য সিদ্ধি পেলেন নবারুণ। তার তৈরি ফ্যাতাড়ু আর চাকতিরা অতীতের সমস্ত প্রেরণা আর ক্লাস লাইন সঙ্গে নিয়েই সমকালীন প্রতিক্রিয়ার মোকাবিলা করল এবং বাংলার সংস্কৃতি জগতে একটি চিরায়ত মিথ হয়ে উঠল। ভোগীর নিরীক্ষা এবং সীমাবদ্ধতা সংক্রান্ত ভাবনা নিঃসন্দেহে প্রত্যক্ষে পরোক্ষে এই আধুনিক ক্লাসিকটির নির্মাণে সক্রিয় থেকেছে।

No comments: